স্বর্ণ চোরাচালানি সিন্ডিকেট ফের সক্রিয় গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে

 

sorno

হাবিবুর রহমান : দেশি ও আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এইসব স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ করেছে গডফাদাররা। দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের ভয়ে স্বর্ণ চোরাচালানি চক্রের গডফাদাররা বিদেশে সিন্ডিকেট তৈরি করে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ পাচার করছে। তারা নতুন নতুন সিন্ডিকেট তৈরি করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাই বসে তারা আন্তর্জাতিকভাবে চোরাচালানি করে আসছে। স্বর্ণ চোরাচালানির গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে অবৈধ স্বর্ণের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। স্বর্ণ চোরাচালানি চক্রের বেশ কিছু সদস্য গ্রেফতারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালানের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন গডফাদার বিদেশে বসে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম মোহাম্মদ আলী। তার পল্টনের বাসা থেকে ৬১ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। মোহাম্মদ আলী গ্রেফতারের ২ মাস পর জামিনে বেরিয়ে দুবাই বসবাস করছেন। সেখানে বসেই দেশে স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়াও দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বসে মোহাম্মদ আলী, মাসুদ করিম, মিন্টু, হামীম ও দিনাজ চোরাচালানের নতুন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের সিন্ডিকেটে কাজ করছে ফারুক আহমেদ, মীর হোসেন, মো. শাহিন, মো. রেজা, আজমীর, রিয়াজ, আমজাদ, রফিক, মফিজ, এরশাদ, শাহিন, মানিক, মাসুদ, করিম রানা, রহমত বারী, মুরাদ, আজাদ, বিজয় ও লালশ্যাম। চক্রগুলো দেশের বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চোরাচালন চক্রের সদস্যরা দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তার মাধ্যমে বিদেশ থেকে আনা স্বর্ণের চালান বিমানবন্দরের বাইরে নিয়ে আসছে। এরপর পৌঁছে দিচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

সূত্র আরো জানায়, স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের গডফাদারদের মধ্যে কয়েকজন মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেফতার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বাকিরা আগে থেকেই পলাতক। এ কারণে মাঝে মধ্যে স্বর্ণের চোরাচালানসহ বাহক বা জড়িতরা আটক হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অপর একটি সূত্র জানায়, দেশে স্বর্ণ চোরাচালানের অন্তত ১৫টি চ্যানেল দিয়ে বিভিন্ন লোক দিয়ে বিদেশ থেকে স্বর্ণ এনে পৌঁছে দেয় নির্দিষ্ট গন্তব্যে। যেখানে এক চ্যানেলের লোক জানে না অন্য চ্যানেলে কে কাজ করে। প্রতিটি চ্যানেলে অন্তত ৮টি পর্যায়ের অংশীজন রয়েছে। তারাই চোরাচালানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকেও সুবিধা ভোগ করে।

গোয়েন্দাদের কাছে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের গডফাদারদের মধ্যে মো. নজরুল ইসলাম লিটন, মো. আলী, রিয়াজ চেয়ারম্যান, জসিম উদ্দিন, আজাদ আহমেদ, মাসুদ কবির, মো. রায়হান আলী, সালেহ আহম্মদ, গৌরাঙ্গসহ (নেপালের নাগরিক) অন্তত ১৫ জন। তাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে পালিয়ে আছে। সেখান থেকেই বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা।

স্বর্ণ চোরাচালান মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে অবৈধভাবে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ আসে দুবাই থেকে। কিছু স্বর্ণ বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। বাকিটা পাচার হয়ে যায় ভারতে। দুবাই-বাংলাদেশ-ভারত, চোরাচালানের জন্য ব্যবহার হচ্ছে এই রুট। এ কারণে চোরাচালানের সঙ্গে ভারতের কিছু ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। গত কয়েক বছরে অবৈধ পথে আসা প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এর মধ্যে প্রায় ১৬শ কেজি স্বর্ণ এককভাবে উদ্ধার করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনীও বিভিন্ন সময় স্বর্ণ জব্দ করেছে।

২০১৩ সাল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৬৬৭ কেজি স্বর্ণ আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। এগুলোর বাজারমূল্য ৭৯১ কোটি টাকা। সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর ৪ কোটি টাকা মূল্যের ৮০টি সোনার বারসহ ৩ ব্যক্তিকে আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য (উত্তর) বিভাগ। আটক ব্যক্তিরা হলো_ মো. ফারুক আহম্মেদ, মীর হোসেন ও মো. শাহীন। তাদের মধ্যে মীর হোসেন রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের ক্যাটারিং বিভাগের কর্মচারী। ফারুক নিজেই চোরাচালানে আসা স্বর্ণের কিছু অংশের মালিক আর শাহীন গাড়িচালক।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরো জানান, ফারুক আহম্মেদ স্বর্ণ চোরাচালান করছে ৩ বছর ধরে। তারা ৩ ভাই মাসুদ করিম রানা, ফারুক আহম্মেদ ও রহমত বারী। ফারুককে ধরার পরদিনই তার ভাই মাসুদ করিম রানাকে আটক করতে গেলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, সে দুবাই পালিয়ে গেছে। মাসুদ একসময় দুবাইয়ে থাকতো। সেখান থেকেই স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মেলায় সে। দেশে ফিরে এসে ২ ভাইকে নিয়ে নিজেই গড়ে তোলে চোরাচালানের সিন্ডিকেট। ৩ বছর ধরে অবৈধভাবে স্বর্ণ আনছে এই সিন্ডিকেট। ২-৩টি স্বর্ণের চালানে সপ্তাহে গড়ে ১৫ কেজি স্বর্ণ আনতো তারা। এর কিছু অংশ বিক্রি করতো দেশীয় বাজারে। বাকিটা পাঠিয়ে দেয়া হতো ভারতে।

চলতি বছরের ২ মার্চ ১২৪ কেজি স্বর্ণ চোরাচালান আটক মামলায় ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ৪ বছরেরও বেশি সময়ের তদন্তে সবশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে চার্জশিট দাখিল করেন ডিবির (উত্তর) সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. গোলাম সাকলাইন। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘ তদন্ত শেষে চার্জশিট জমা দিয়েছি। কিন্তু সমস্যা হলো জড়িতদের অনেকে জামিনে বেরিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। এরপর তারা আবারও নতুনভাবে স্বর্ণ চোরাচালান শুরু করেছে।

গত জানুয়ারিতে ১০৫ কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের মামলার চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। এতে আসামি করা হয় বিমানের পরিদর্শন কর্মকর্তা শাহজাহান সিরাজ, এসএম আবদুল হালিম, এয়ারক্রাফট মেকানিক এসিস্ট্যান্ট আনিস উদ্দিন ভূঁইয়াসহ ২৫ জনকে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাকির হোসেন বলেন, কোনো অভিযানে গিয়ে হয়তো ১০টি বারসহ ১ চোরাকারবারীকে আটক করা হলো। সেভাবেই কাগজপত্র তৈরি হয়। কিন্তু ঐ চোরাকারবারী সিনিয়র অফিসারের সামনে এমনকি আদালতে গিয়েও বলল তার কাছে ১৫টি স্বর্ণের বার ছিল। এ ধরনের ঘটনায় আদালতে এবং সিনিয়রদের কাছে আমাদের বিব্রত হতে হয়। এরপর স্বর্ণ চোরাচালানের তথ্য জানলেও অনেকেই তেমন আগ্রহ দেখান না। এছাড়া গ্রেফতারের পর প্রভাবশালীদের চাপ তো আছেই। তারা বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানিদের গ্রেফতার ও মামলা তদন্ত করতে সমাজের নানা প্রভাবশালী মহল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এতে তদন্ত কর্মকর্তারা বিব্রত হন।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান জানিয়েছেন, চোরাচালানে জড়িত থাকার অপরাধে ২ শতাধিক বাহক ও মূল হোতাদের আটক করা হয়েছে। স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আমরা যৌথভাবে কাজ করছি। নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করছি। যেখানেই তথ্য পাচ্ছি, সেখানে সবাই একযোগে কাজ করছি। স্বর্ণ চোরাকারবারী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে। কারণ স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে মানিলন্ডারিং জড়িত। তাই এখানে নিরাপত্তার ইস্যুও সামনে চলে আসে। তাই স্বর্ণ চোরাচালান বন্ধে আমাদের অবস্থান একেবারে স্পষ্ট। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

Post a Comment

Previous Post Next Post