ত্রাণ অপ্রতুল সঙ্কট তীব্র হচ্ছে

roano

রোয়ানুর আঘাতে ৫৮ হাজার ঘরবাড়ি ও লক্ষাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের জন্য হাহাকার ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ

KBDNEWS রিপোর্ট :  ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে উপকূল। প্রাথমিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস এবং গাছ ভেঙে ও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়ে দেশের উপকূলীয় ১১ জেলায় লক্ষাধিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৮ হাজার ৪৩০টি। সরকারি তথ্যে ঘূর্ণিঝড়ে সারাদেশে মারা গেছেন ২৪ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ রোববার সন্ধ্যার ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য থেকে এসব বিষয় জানা গেছে।
ভেসে গেছে চিংড়ি ঘের, লবণের মাঠ। গবাদি পশুও মারা গেছে। বেড়িবাঁধ ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

এতে দুর্গত লোকজনের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্গত এলাকায় এখনো পর্যন্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। ক্ষয়ক্ষতি কবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া শুকনো খাবারেরও রয়েছে অপ্রতুলতা। কোথাও কোথাও ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার। তাছাড়া অনেক এলাকার ঘরবাড়ি ৬/৭ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এখনো রান্না করার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। অনেকে এখনো ঘরবাড়িতে পৌঁছাতে পারেনি। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন অনেকেই। তাছাড়া লবণাক্ত ও দূষিত পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। খাবার স্যালাইনসহ বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এখনো অনেক এলাকায় নিশ্চিত করা যায়নি।

উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রামে। এরপরের অবস্থানে রয়েছে কঙ্বাজার। ১১ জেলা থেকে পাওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রোয়ানুতে পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৪০টি। বাড়িঘরের মধ্যে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২২ হাজার ১৫২টি ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬ হাজার ২৭৮টি।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ গত শনিবার দুপুরের দিকে বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে। বিকেলের মধ্যে এটি উপকূল অতিক্রম করে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চল জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে।

ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ে ১১ জেলার ৩৫টি উপজেলার ২৪২টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তথ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে ৭৬ হাজার ৬৪২টি পরিবার, কঙ্বাজারে ৭ হাজার ৯৪৫, নোয়াখালীতে ৬ হাজার ৫০০, লক্ষ্মীপুরে ২ হাজার ৫০০, ফেনীতে ১৩৩, চাঁদপুরে ৩ হাজার, বরিশালে ২ হাজার ৮০০, ভোলায় ৪ হাজার, পটুয়াখালীতে ২ হাজার, পিরোজপুরে ২ হাজার ২০, খুলনায় এক হাজার ১০০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির মধ্যে চট্টগ্রামে ২০ হাজার ৮৭৭, কঙ্বাজারে এক হাজার ২২৮, পটুয়াখালীতে ৭, খুলনায় ৪০টি রয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২৫ হাজার ৩২৬, কঙ্বাজারে ৭ হাজার ২২, চাঁদপুরে এক হাজার ৫০০, বরিশালে ৮০০, পটুয়াখালীতে এক হাজার ৫০০, পিরোজপুরে ১০, খুলনায় ১২০টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮ কিলোমিটার, শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮টি, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ২২টি। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মধ্যে ফেনীতে ১০টি, বরিশালে ৭টি ও খুলনায় ৭টি রয়েছে।

উপকূলীয় জেলা বরগুনা, ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

জাতীয় দুর্যোগে সাড়াদান ও সমন্বয় কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দলিল উদ্দিন বলেন, ‘উপকূলীয় সব জেলা প্রশাসকের কাছে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য চাওয়া হয়েছে। কয়েকজন জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন তারা তথ্য সংগ্রহ করছেন, শিগগিরই পাঠিয়ে দেবেন। ফসলসহ সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেতে আমাদের আরও দু-তিন দিন লাগতে পারে।’

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার ১০৪টি ইউনিয়নের ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন প্রাথমিক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে। এরমধ্যে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮১ হাজার ৪১১ জন মানুষ। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ লাখ ১ হাজার ৬৭৫ জন মানুষ। এরমধ্যে প্রাণহানি ঘটেছে ১২ জন মানুষের।

গতকাল সোমবার ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী এই ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ প্রকাশ করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৯ জনসহ চট্টগ্রামে মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৪টি ওয়ার্ডসহ মোট ১০ উপজেলায় ১০৪টি ইউনিয়নের ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এরমধ্যে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৮১ হাজার ৪১১ জন এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ লাখ ১ হাজার ৬৭৫ জন মানুষ। মোট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৭টি। এরমধ্যে ১৯ হাজার ৪৩৭টি পরিবার সম্পূর্ণ ও ৮৩ হাজার ৬৬০টি পরিবার আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা ২০ হাজার ৮৯২টি। আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা ২৫ হাজার ৭৬৬টি। রোয়ানুর আঘাতে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের পরিমাণ ১৫৪ একর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৫৪১ একর জমির ফসল।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে মারা গেছে ৮০টি গবাদিপশু ও ৪০ হাজার ৫৫০টি হাঁস-মুরগি। এ ছাড়া ৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১২টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ৪৭ কিলোমিটার রাস্তা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়ে ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ও ৬৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আমাদের ভোলা প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র প্রভাবে ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ায় ভোলার চার উপজেলার প্রায় এক হাজার পরিবার খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। গত শনিবার (২১ মে) দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অতিক্রম করে ঘূণিঝড় ‘রোয়ানু’। এতে ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ পরিবারের মাঝে এখনো (২৩ মে) ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। ঝড়ে ভোলা সদর, তজুমদ্দিন, লালমোহন ও দৌলতখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে বেশকিছু এলাকা। অসংখ্য মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বেশকিছু এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও বেশিরভাগ মানুষ তা পায়নি বলে অভিযোগ করেছে তারা।

তজুমদ্দিনের ক্ষতিগ্রস্ত জসিম উদ্দিন বলেন, তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অসহায় অবস্থায় রয়েছি, সরকারি সাহায্য এখনও আসেনি। ইউসুফ হোসেন ও জেলে বাসু বলেন, পুকুর ও ডোবার পানি নোংরা হয়ে গেছে। আশপাশে টিউবওয়েলও নেই। তাই পানযোগ্য পানির সংকটে আছি। এছাড়া দিন আনি দিন খাই, সংসারে খাবার কেনার টাকাও নেই। ঘরেও রান্না করার কিছু নেই। ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে আছি।

শফির উদ্দিনের স্ত্রী পিয়ারা বেগম বলেন, সাতবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছি। ঋণ নিয়ে নতুন করে ঘর তৈরি করেছিলাম, এই ঝড়ে তাও শেষ। এদিকে, ঝড়ের দিন থেকে সোমবার পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার লাখ টাকা ও ৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। তবে দুর্গম হওয়ায় সব এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। দুর্গত এলাকায় কাজ করছে ৯২টি মেডিকেল টিম। জেলা প্রশাসক মো. সেলিম উদ্দিন জানান, আরো বরাদ্দ পেলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের বিত্তবানরাও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

কোন জেলায় কতজন মারা গেছেন : মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২৪ জনের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামে ১১, কঙ্বাজারে ৪, নোয়াখালী ও ভোলায় ৩ জন করে নিহত হয়েছেন। লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও পটুয়াখালীতে একজন করে মারা গেছেন। ঘূর্ণিঝড়ের সময় গাছ, ঘর, দেয়ালচাপা ছাড়াও ভূমিধস, পানির স্রোত, নৌকা ডুবে এরা মারা গেছেন। মারা যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব।

Post a Comment

Previous Post Next Post